প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। গত ৪ মে ঘোষিত নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, দীর্ঘ ১৫ বছরের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসন অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৬টিতে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) মাত্র ৮০টি আসনে সংকুচিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই জয়কে ‘পরিবর্তন’ এবং সুশাসনের জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী এমনকি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে তাঁর দীর্ঘদিনের আসন ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে প্রায় ১৫,০০০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। এই ফলাফলকে বিশ্লেষকরা টিএমসি-র ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তির অবসান হিসেবে দেখছেন।
এই বিশাল জয়ের সমান্তরালে একটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে। নির্বাচনের ঠিক আগে প্রায় ৯০.৬৬ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।
বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের অবস্থান: নির্বাচন কমিশন এটিকে মৃত, স্থানান্তরিত ও ভুয়া ভোটারদের বাদ দেওয়ার একটি রুটিন ‘শুদ্ধিকরণ’ প্রক্রিয়া হিসেবে দাবি করেছে।
তৃণমূল ও বিরোধীদের অভিযোগ: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ফলাফলকে ‘জনমতের লুট’ এবং ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে যে, মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং উত্তর ২৪ পরগনার মতো মুসলিম প্রধান জেলাগুলোতে ভোটার বাতিলের হার ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি, যা তৃণমূলের ভোট ব্যাংকে বড় প্রভাব ফেলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের এই পটপরিবর্তন ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
বিংশ শতাব্দীর শুরু ও বঙ্গভঙ্গ (১৯০০-১৯৪৭): ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ উত্তরকালে এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে প্রথম তীব্র রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত হয়। তখন থেকেই ভোটার অধিকার এবং মানচিত্র নির্ধারণ নিয়ে লড়াই শুরু হয়েছিল। ব্রিটিশদের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি যেভাবে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করেছিল, বর্তমানের ‘পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি’ (Identity Politics) তারই এক আধুনিক রূপ বলে অনেকে মনে করেন।
বাম শাসন ও পরিবর্তনের সূচনা (১৯৭১-২০১১): ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব দেখা দিলেও পরে ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের পর ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পরিবর্তন’-এর ডাক দিয়ে ক্ষমতায় আসেন।
২০২৪-এর বৈশ্বিক প্রভাব ও ২০২৬-এর নতুন দিগন্ত: ২০২৪ সালের বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্থান-পতনের রেশ ধরে ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ১৯০০ সালের সেই পরাধীন আমলের বিভাজন থেকে ২০২৬ সালের আধুনিক গণতন্ত্রে এখন ডিজিটাল ভোটার তালিকা এবং আইনি লড়াই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয় এবং বিজেপির উত্থান প্রমাণ করে যে, উন্নয়ন ও সুশাসনের দাবি এখন অনেক বেশি জোরালো।
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো রাজনৈতিক শক্তিই চিরস্থায়ী নয়। ১৯০০ সালের প্রাচীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে ২০২৬ সালের আধুনিক পশ্চিমবঙ্গ—বাঙালির রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব সবসময়ই অধিকার ও পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলেছে। ৯০ লাখ ভোটার বাদ পড়া এবং টিএমসি-র ভরাডুবি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, ২০২৬ সালের এই ফলাফল ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে এক বিশাল প্রভাব ফেলবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি এবং সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ঘোষণা বিষয়টিকে একটি ‘সাংবিধানিক সংকটের’ (Constitutional Crisis) দিকে ঠেলে দিয়েছে। ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ এখন আদালতের রায় এবং নতুন সরকারের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করছে।
সূত্র: ১. ভারত নির্বাচন কমিশনের (ECI) অফিসিয়াল ফলাফল (৫ মে, ২০২৬)। ২. এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়া প্রকাশিত নির্বাচনী বিশ্লেষণ প্রতিবেদন। ৩. ঐতিহাসিক দলিল: বিংশ শতাব্দীর বঙ্গ রাজনীতি ও ভোটার তালিকা বিবর্তনের ইতিহাস (১৯০০-২০২৬)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |